বর্তমানে ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট আমাদের জীবনটাকে যেমন সহজ করেছে, ঠিক তেমনি কিছু ভয়ংকর ফাঁদও তৈরি করেছে। সেই ফাঁদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অনলাইন জুয়া। অনলাইন জুয়া বলতে বোঝায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভাগ্যনির্ভর খেলায় অংশগ্রহণ করা। যেমন : অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, কার্ড গেম, লটারি ইত্যাদি। এমনকি কিছু গেমিং অ্যাপও পরোক্ষভাবে অনলাইন জোয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
অনলাইন জোয়ার প্রতি আসক্তি হটাৎ করে তৈরি হয় না, এটি ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। প্রথম ধাপে কৌতুহলবশত বা বন্ধুদের প্ররোচনায় খেলতে শুরু করে। দ্বিতীয় ধাপে কেউ একবার জিতে গেলে তার মনে ভুল ধারণা জন্মায় যে Ñ সে হয়তো কৌশল জানে বা তার ভাগ্য ভালো। তৃতীয় ধাপে হার শুরু হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় বারবার খেলতে থাকে। এভাবে জুয়া হয়ে ওঠে নেশার মতো যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন।
এগুলো আকর্র্ষনীয় হওয়ার কয়েকটি কারণ আছে। যেমন : ঘরে বসে খেলা যায়, শুরুতে অল্প টাকায় বড় লাভের লোভ দেখানো হয়। আজ জিতবে,শেষ সুযোগ, বোনাস ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করা হয়। হারলেও আবার উৎসাহ করে দেওয়া হয়। এই পক্রিয়ায় একজন মানুষ বুঝতেই পারে না সে কখন বিনোদনের জায়গা থেকে আসক্তিতে ঢুকে পড়েছে। অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো অর্থনৈতিক ক্ষতি। অনেকেই নিজের জমানো টাকা, পড়াশোনার খরচ, এমনকি ধার করা টাকাও জুয়ায় হারিয়ে ফেলে। ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে এবং সংসারে অশান্তি তৈরি হয়।
জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত , রাগী ও একাকী হয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে পরিবার , বন্ধুদের সাথে স¤পর্ক নষ্ট হয়। শিক্ষাথীদের ক্ষেএে অনলাইন জুয়া মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মনযোগ কমে যায়, ফলাফল খারাপ হয়। কর্মজীবনে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা তৈরি হয়, যা চাকরি হারানোর কারণও হতে পারে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে কেউ কউে মিথ্যা বলে এবং অপরাধের পথেও পা বাড়ায়। এতে সমাজে অপরাধ প্রবণতাও বাড়ে। তরুণদের আবেগ বেশি ধৈর্য কম এবং দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতা প্রবল। অনলাইন জুয়ার প্লাটফর্মগুলো এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। সহজে টাকা , এক রাতেই বড়লোক Ñ এই ধরনের মিথ্যা সপ্ন তরুণদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে।
অনলাইন জুয়ার আসক্তি থেকে মুুক্তি থেকে পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক সচেতনতা ও পদক্ষেপ নিলে এ থেকে বেরিয়ে আসা যায়। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নিজের সমস্যা নিজে স্বীকার করা।আমি নিয়ন্ত্রণে আছি এই আত্বপ্রবঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এছাড়া নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সীমা নির্ধারণ করতে হবে। এছপড়াও খেলাধূলা, বই পড়া, নতুন কোনো দক্ষতা শেখা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়াÑ এসব অভ্যাস জুয়ার প্রতি আগ্রহ কমাতে সাহায্য করে।
অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে শুধু ব্যাক্তির সচেতনতা যতেষ্ট নয়। রাষ্ট্র ও সমাজকেও ভূমিকা রাখতে হবে। সেজন্য অবৈধ জুয়া সাইট বন্ধের কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা করতে হবে। গণমাধ্যমে অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে হবে।
অনলাইন জুয়া কোনো খেলাধূলা নয়, এটি একটি অন্ধকার রাস্তা। যে পথে একবার পা রাখলে ধীরে ধীরে আলো কমে আসে, চারপাশ নিঃশব্দ হয়ে যায়। এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সময় আছে। আমাদের বুঝতে হবে জীবন জুয়ার টেবিল নয়। জীবন হলো সম্ভাবনার বিস্তৃত মাঠ, যেখানে জয় আসে পরিশ্রমে , সততায় আর ধৈর্যে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার মিথ্যা সপ্ন নয়,ধীওে ধীরে গড়ে ওঠা বাস্তব সাফল্যই আসমাদের সত্যিকারের নিরাপত্তা। আজ আমরা যদি সচেতন হই তবে আগামীদিনগুলো আলোকিত হতে পারে। তাই অনলাইন জুয়ার মিথ্যা আলো নয়, সত্যিকারের জীবনের আলোই হোক আমাদের পথচলার সঙ্গী।
শিক্ষার্থী ,
হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ