বাপা ও ক্যাবের আয়োজনে জ্বালানি রূপান্তরে ন্যায্য বিনিয়োগ ও জনস্বার্থ নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
ঢাকা, ৫ মার্চ: জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ চুক্তিতে স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, প্রতিযোগিতাহীন ও অসম চুক্তির কারণে দেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে এবং এতে জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাব–এর তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ চুক্তি ও জনস্বার্থ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম এ মায়ীদ। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া এবং সূচনা বক্তব্য দেন বাপার সহ-সভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী জাকির হোসেন।
মূল প্রবন্ধে প্রকৌশলী এম এ মায়ীদ বলেন, ‘বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি ১৯৯৬ (সংশোধিত ২০০৪)’ আন্তর্জাতিক মানের একটি ক্রয় নীতি ছিল, যার অধীনে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক ছিল। তবে ২০১০ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের দ্রুত বর্ধন (বিশেষ বিধান) আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়। এর ফলে প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অসম চুক্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়। তিনি বলেন, জ্বালানি খাত ক্রমে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে চলে গেছে এবং বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, নিরবচ্ছিন্ন ও সুলভ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশের জ্বালানি খাতকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, অতীতে সম্পাদিত অসম চুক্তিগুলো জনগণের সামনে প্রকাশ করে প্রয়োজন হলে সেগুলো বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণের মৌলিক অধিকার। দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো বাতিল করে জনমুখী জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, দেশের গ্যাস উত্তোলনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অনেক ক্ষেত্রে অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। ফলে দেশীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হয়নি এবং বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে জনগণের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

রাজনীতিবিদ রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জ্বালানি খাতে যে কোনো নীতি গ্রহণের আগে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, বিদ্যুৎ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা হওয়ায় এটি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে।
সভায় বক্তারা জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতাহীন বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা, জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, কোষাধ্যক্ষ আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খানসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যরাও সভায় অংশ নেন।