• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন
Headline
সুন্দরবনের পাশে আমরা কতটা আছি ত্রয়োদশ নির্বাচন ও আমাদের প্রত্যাশাঃ পরিবেশ সুরক্ষা প্রাধান্য পাবে তো? নিরাপদ সড়ক: প্রতিশ্রুতি না প্রহসন? সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ‘নিরব এলাকা’ বাস্তবায়নে সমন্বিত অভিযান গ্রীন ভয়েস দিনাজপুর সরকারি কলেজ শাখার নতুন কমিটির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বহ্নিশিখার ৭ দিনব্যাপী নারীদের আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ২০২৫ বিধিমালা: নিরব এলাকায় সরব থাকবে পুলিশ, ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা নুরের সুস্থতা চেয়ে ঘটনা তদন্তের আহ্বান তারেক রহমানের জ্ঞান ফিরেছে নুরের, শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা জানা গেল রাবিতে আত্মরক্ষা কৌশল প্রশিক্ষণের উদ্বোধন

সুন্দরবনের পাশে আমরা কতটা আছি

সৈকত মল্লিক
Update : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃত সুবিশাল ভূখণ্ড নিয়ে যে প্রাকৃতিক বনায়ন গড়ে উঠেছে তাকেই মূলত সুন্দরবন নামে ডাকা হয়। সুন্দরবন হলো বিশ্বের বৃহত্তম অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বন বা লবণাক্ত বনাঞ্চল, যা জোয়ার-ভাটার কারণে সৃষ্ট নোনা পরিবেশ এবং শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদের (যেমন সুন্দরী, গেওয়া) জন্য পরিচিত। পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার কিছু অংশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত। বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে বাংলাদেশ ও ভারতে বিস্তৃত এই বনভূমি তার অনন্য জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল এবং প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এটি বাংলাদেশের এক অনন্য জীববৈচিত্রের আধার।সুন্দরবনের ছোট ছোট স্রোত জলধারায় রয়েছে সকল বিপন্ন প্রাণী। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রাণী যেমন:রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির,হরিণ, সাপ, বনশূকর সহ প্রভৃতি প্রাণী । যেগুলো সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের প্রধান আধার।

বাংলাদেশে যেমন রয়েছে, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, চলনবিল,কাপ্তাই হ্রদ তেমনি রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের আধার হিসেবে খ্যাত সুন্দরবন। এই সুন্দরবন শুধু সুন্দরী কাঠ ও গোলপাতার জন্যই বিখ্যাত নয় ;এটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় মানুষ তথা সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের জন্য জীবন রক্ষা কর্তাও বটে।এটি উপকূলীয় (সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, বরগুনা ও পটুয়াখালী ) মানুষদের জীবন রক্ষার প্রাকৃতিক ঢাল।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের (ঝড়-বন্যা-ঘূর্ণিঝড়) প্রকোপ থেকে দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলীয় উপকূলীয় মানুষদের রক্ষা করে থাকে। তাই উপকূলের প্রতিটির জনগণের জীবনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে সুন্দরবন জড়িত। বলা যায়, ঝড়ো আবহাওয়ায় উপকূলীয়বাসীর শ্বাস প্রাণ।

এটি ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাসের গতি প্রবাহ রুদ্ধ করে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ থেকে রক্ষা পায়। তাই ধীরে ধীরে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে সুন্দরবন পরিচিত।

উপকূলবর্তী চারটি জেলা যেমন সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও বরগুনার কিছু অংশ নিয়ে সুন্দরবন বিস্তৃত। ইতিহাসের পাতার দিকে যদি দৃষ্টি অবলোকন করি তবে দেখতে পাই,প্রাচীনকাল থেকেই সুন্দরবন উপকূলবর্তী অঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপনের মূল ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রকৃতির প্রতিকূল আবহাওয়ার স্বনির্ভরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে এখানে বসতি গড়ে উঠেছে। বসতি স্থাপনের সকল উপাদানের নির্ভরতাই ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবনের এখনো শত শত বসতির জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস এর প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রাচীনকাল থেকেই মৌয়াল, জেলে, বাওয়ালীদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তারা সুন্দরবনের কাঠ কাটা, মৎস্য ধরা, মধু আহরণ করাসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে বেঁচে থাকে। এজন্যই তাদের কাছে সুন্দরবন এক জীবন্ত প্রাণ। এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের নির্ভরতা হয়ে উঠেছে সুন্দরবন।

বিশ্বজুড়ে যেমন জলবায়ু পরিবর্তন একটি হুমকি স্বরূপ।ঠিক তেমনি সুন্দরবনের নিকট অপরিচিত কিছু নয়। আজ সুন্দরবন বাংলাদেশের নিকট শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর ক্ষেত্র নয় ;এটি তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির দিকে ক্রমান্বয়ে ধাবিত হচ্ছে। সুন্দরবন থেকে বিপুল পরিমাণে অনৈতিকভাবে সম্পদ আহরণের ফলে দিনকে দিন পরিবেশগত প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনে লবণাক্ততা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। ফারাক্কা বাঁধসহ উজানের বিভিন্ন নদী অববাহিকায় বাঁধ নির্মাণের ফলে গঙ্গা-পদ্মা দিয়ে সুন্দরবন অঞ্চলে মিঠা পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে এই প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনা পানি বনের অনেক দূর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে।এছাড়াও উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ কেটে লোনা পানি প্রবেশ করিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষের ফলে আশেপাশের বন ও মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত লবণাক্ততা সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের “আগামরা” রোগসহ সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। সুন্দরবনের গভীরে নদী কেন্দ্রীক যে বৃহত্তর শিল্পায়ন গড়ে উঠেছে তা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে অনবরত ধ্বংস করছে।
এই ধ্বংসের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু আমরা সেই দায়িত্ব কর্তব্য জ্ঞানকে ভুলতে চলেছি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে বন সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে চলেছি।

প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস পালিত হয় । কিন্তু এটা কি শুধু সারা বছরের একটি দিনের জন্য আনুষ্ঠানিকতা পালন করা? নাকি সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার্থে সকলে এগিয়ে আসা?

সুন্দরবনের আয়তন ও পরিবেশগত ভারসাম্য যদি ক্রমাগত হ্রাস পায়, তবে তা রাষ্ট্রের নীতিগত দুর্বলতা এবং নাগরিক সচেতনতার অভাব—উভয়েরই প্রতিফলন।
ভূ-তত্ত্ববিদরা বলছেন, সুন্দরবনের আয়তন দিন দিন কমে যাচ্ছে। আয়তন কমে আসায় সুন্দরবনের পরিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কমে আসছে গাছগালা, লতাগুল্ম ও প্রাণী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে সুন্দরবন দুর্বলও হয়ে পড়ছে।
২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে সুন্দরবনের আয়তন কমে আসার কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুন্দরবন ও বনসংলগ্ন এলাকার মানুষের টিকে থাকার বিষয়ে প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯০৪-২৪ সালে সুন্দরবনের আয়তন ছিল ১১ হাজার ৯০৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৭ সালে তা কমে হয় ১১ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালে আয়তন কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫০৬ বর্গকিলোমিটারে। ২০১৫-১৬ সালে আয়তন ছিল ১১ হাজার ৫০৬ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ গত ১০০ বছরে সুন্দরবনের আয়তন ৪৫১ বর্গকিলোমিটার কমে গেছে।
সুন্দরবনের পশু সংরক্ষণ আইন নীতিমালা লংঘন করে বাঘ ও হরিণ হত্যা করে পশু চামড়া অনৈতিকভাবে রপ্তানি করে কিছু অসাধু চক্র। এরা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করার সাথে সর্বদা জড়িত। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও তারা কিভাবে সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করে। তবে কি তা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নয়?নাকি নাগরিকদের সচেতনতার অভাব?
সুন্দরবনের ভবিষ্যতের উপর প্রশ্ন জাগে। প্রতিবছর এই দিনটিতে বিভিন্ন স্লোগান মিছিল বের হয়। কিন্তু সেই স্লোগান আর পরে বাস্তবে রুপ লাভ হয় না। স্লোগান ওঠে, সুন্দরবন বাঁচলে আমরা বাঁচবো -তবে এটা কি শুধু একটি স্লোগান। ২০ থেকে ৩০ বছর পরে সুন্দরবনের মানচিত্র কেমন হবে।

বর্তমান মানচিত্র প্রেক্ষাপটে যদি অপরিবর্তিত থাকে তবেই তা সরকারের সাফল্য তথা বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের সাফল্য। সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রাকৃতিক প্রাচীর। এই প্রাচীর ভেঙে গেলে মানচিত্রে শুধু ভূমি নয়, বিপন্ন হবে মানুষের ভবিষ্যৎও। তাই প্রশ্ন রয়ে যায়—সুন্দরবনের পাশে আমরা সত্যিই কতটা আছি?

সৈকত মল্লিক
শিক্ষার্থী,
ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়
saikatmallik1770@gmail


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category