শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর প্রধান কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সুন্দরবন দিবস উপলক্ষে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। শুরুতে সহ-সভাপতি জাকির হোসেন শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন।
সভায় সুন্দরবন ও উপকূল রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সাংবাদিক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে তা পরিবেশবান্ধব নয়; বরং এর ফলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি পরিবেশসম্মত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় স্থানীয় মানুষের সহাবস্থান গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, লবণাক্ততা ও বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এ বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় নতুন সরকারকে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট একাডেমি, বিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি জোর দেন।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিহির বিশ্বাস ও হুমায়ুন কবির সুমন, নির্বাহী কমিটির সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবীব, হাফিজুল ইসলাম, মোনছেফা তৃপ্তি, ফাহমিদা নাজনীন, জাতীয় কমিটির সদস্য শাখাওয়াত হোসেন স্বপন, আব্দুর রহিম, পরিবশ অনুরাগী মোঃ আবু সেলিমসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থীগণ।
সভার শেষে নিম্নোক্ত দাবিসমুহ উত্থাপন করা হয়ঃ
১। ১৪ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে জাতীয় সুন্দরবন দিবস হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। এর মাধ্যমে সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
২। নতুন সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুন্দরবন রক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রকল্প গ্রহণ, পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মতো কার্যকর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৩। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে উজানের পানিপ্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মানুষ, জীববৈচিত্র্য ও মিঠাপানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
৫। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সুন্দরবন সম্পর্কিত সঠিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও সংরক্ষণমনস্কতা গড়ে উঠবে।
৬। সুন্দরবন ভ্রমণে যাওয়ার আগে পর্যটকদের নিয়ম-কানুন জানা এবং তা অনুসরণ করা নিশ্চিত করতে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে পর্যটন কার্যক্রম পরিবেশের ক্ষতি না করে।
৭। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকাকে প্লাস্টিকমুক্ত ইমপ্যাক্ট জোন ঘোষণা করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
৮। বনের ওপর চাপ কমাতে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই বিকল্প জীবিকা তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বনসম্পদের ওপর নির্ভরতা কমবে।