আপনাদের আদনান তাসিনের কথা মনে আছে? সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জেব্রা ক্রসিং দিয়ে নিয়ম মেনে রাস্তা পার হচ্ছিল। কিন্তু নিয়ম মানার কোনো মূল্য সে পায়নি। দ্রুতগামী, বেপরোয়া একটি বাস বিমানবন্দর শ্যাওড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তাকে চাপা দিয়ে চলে যায়।
তাসিন তখনও বেঁচে ছিল। তাকে ভর্তি করা হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়ার পথে বনানীর কাছে ভয়াবহ যানজটে গাড়িটি আটকে পড়ে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে অ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়ে বনানী কবরস্থান সড়ক হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো যায়নি।
আমি, আপনি—অনেকেই হয়তো তাসিনের কথা ভুলে গেছি।
তাসিন একা নয়। জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরই প্রাণ গেছে শিক্ষার্থী আব্রারের। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থেকেও রমিজউদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া করিম রক্ষা পায়নি। সিলেটের অয়াসিম, সাভারের শিল্পী—বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা। উত্তরা এলাকায় ভাড়া নিয়ে তর্কের জেরে এক যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে চাকার নিচে পিষে হত্যা করা হয়েছে—শতাধিক যাত্রীর সামনে।
এসব কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি অমানবিক ও দায়হীন পরিবহন সংস্কৃতির নগ্ন প্রতিচ্ছবি? এই মৃত্যু কি শুধু “দুর্ঘটনা”? নাকি এটি কাঠামোগত অবহেলা ও শৃঙ্খলাহীনতার ফল—একটি সড়ক হত্যা?
বাংলাদেশে সড়ক যেন এখন এক নীরব যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে দুর্ঘটনার খবর—কোথাও বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান পথচারী, কোথাও মোটরসাইকেলের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে নিভে যায় তরুণ প্রাণ। এই অব্যাহত প্রাণহানির স্মরণে ১১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ‘সড়ক হত্যা দিবস’। প্রশ্ন জাগে—নিরাপদ সড়কের যে প্রতিশ্রুতি বছরের পর বছর শোনা যাচ্ছে, তা কি বাস্তব অগ্রগতি, নাকি নিছক প্রহসন?
সড়কে মৃত্যু থেমে নেই। গত ৪ জানুয়ারি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়—২০২৫ সালজুড়ে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন; আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৮৩ জন। ছোট যানবাহনের দ্রুত বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণহীন চালক ও নিয়ন্ত্রণহীন গতি মহাসড়ককে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এক বছরে হু হু করে বেড়েছে এসব যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ রিকশায় ব্যাটারি সংযোজন করে তা সড়কে নামানো হয়েছে। গতি বাড়লেও ব্রেকিং ব্যবস্থা দুর্বল। চালকদের বড় অংশ অদক্ষ; যত্রতত্র পার্কিং ও এলোমেলো চলাচলে সড়কের বিশৃঙ্খলা বহুগুণ বেড়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন এই প্রবণতা এখন সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম বড় হুমকি।
সংখ্যাগুলো তো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন তো আমরা করতেই পারি- আমরা কি সত্যিই সড়ককে নিরাপদ করতে চাই? নাকি কিছুদিন শোক প্রকাশ করে আবার ভুলে যাই?
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কেবল দুর্ঘটনা নয়; অনেক ক্ষেত্রেই তা অবহেলা, বিশৃঙ্খলা ও দায়হীনতার ফল। পরিবহন খাতে অনিয়ম, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা যেন নিয়ন্ত্রণহীন। সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন, কঠোর শাস্তির বিধান, ভ্রাম্যমাণ আদালত—এসব উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব চিত্রে পরিবর্তন সীমিত।
২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে সড়ক নিরাপত্তা। সরকার আইন প্রণয়ন করে, সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—আইনের প্রয়োগে শিথিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাপের কারণে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কেবল চালকের দায় নয়; অবকাঠামোগত দুর্বলতাও বড় কারণ। অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, ফুটপাত দখল, অকার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল, পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং ও আন্ডারপাসের অভাব—এসবই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রামাঞ্চলে মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে স্থানীয় ধীরগতির যান চলাচল এক ভয়াবহ সংঘর্ষ পরিস্থিতি তৈরি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) বহুবার সতর্ক করেছে—উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা তরুণ জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। একইভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নিয়মিতভাবে ফিটনেস ও লাইসেন্স তদারকির কথা বললেও বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
সমস্যার আরেকটি বড় দিক চালকদের কর্মপরিবেশ। নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানো, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, দৈনিক চুক্তিভিত্তিক আয়—এসব কারণে তারা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। ফলে দুর্ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট।
আজ ১১ ফেব্রুয়ারি—সড়ক হত্যা দিবস। আজ কেবল শোক পালনের দিন হোক—তা আমরা চাই না। আজ জবাবদিহি দাবি করার দিন। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার চায়, ক্ষতিপূরণ চায়, ভবিষ্যতে এমন মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি বন্ধের নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া ভুক্তভোগীদের আস্থাকে নড়বড়ে করে দেয়।
তবে আশার জায়গাও আছে। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল লাইসেন্সিং, স্কুল-কলেজে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা—এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিবর্তন সম্ভব। গণপরিবহন খাতে রুট রেশনালাইজেশন এবং প্রতিযোগিতামূলক দৌড় বন্ধ করাও জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বও। হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক আইন মানা, পথচারীর অধিকার সম্মান করা—এসব আচরণগত পরিবর্তন ছাড়া টেকসই সমাধান আসবে না।
আমরা যেন ভুলে না যাই—প্রতিটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের স্থায়ী শোক, একটি স্বপ্নের অকাল সমাপ্তি। নিরাপদ সড়ক যদি কেবল ব্যানার-ফেস্টুনে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে প্রহসন। কিন্তু যদি আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি ও নাগরিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটে, তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
প্রশ্ন এখন আমাদের সবার কাছে—আমরা কি আরেকটি ১১ ফেব্রুয়ারির অপেক্ষায় থাকব, নাকি আজই নিরাপদ সড়কের দাবিকে বাস্তবে পরিণত করব?
আদনান তাসিনের মতো আর কোনো শিক্ষার্থী যেন জেব্রা ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে প্রাণ না হারায়—এই অঙ্গীকার যদি বাস্তবে রূপ না পায়, তবে প্রতি বছর ১১ ফেব্রুয়ারি শুধু আরেকটি শোক দিবস হয়েই থাকবে।
মোনছেফা তৃপ্তি
নির্বাহী পরিচালক,
সেইফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশন
সহ-সমন্বয়ক, গ্রীন ভয়েস