আগামীকাল বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়; বরং এটি আমাদের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকারের দিন। একজন পরিবেশবাদী মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, নির্বাচন মানে শুধু ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়া নয়; বরং আমরা কেমন রাষ্ট্র, কেমন উন্নয়ন এবং কেমন ভবিষ্যৎ চাই—তার স্পষ্ট ঘোষণা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন বহুবার মোড় ঘুরিয়েছে। কখনও তা আশার আলো জ্বালিয়েছে, কখনও হতাশার দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। কিন্তু প্রতিবারই শেষ কথা বলেছে জনগণ। আমরা যারা পরিবেশ, সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করি, তারা জানি—রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে যদি মানুষ ও প্রকৃতি না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন গুটিকয় মানুষের পকেটভর্তি সাফল্য হয়ে দাঁড়ায়; তা গণমানুষের উন্নয়ন নয়।
আজ বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি পরিবেশ বিপর্যয়, যার জন্য আমরাই দায়ী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। উপকূলীয় অঞ্চল লবণাক্ততায় বিপর্যস্ত; অন্যদিকে খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা বেড়েছে। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ নগরজীবনকে অসহনীয় করে তুলছে। নদীগুলো দখল ও দূষণে মৃতপ্রায়, বনভূমি ক্রমেই সংকুচিত। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা ও জলাধার ভরাট আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
এবারের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব প্রতিশ্রুতি দেশের প্রেক্ষাপটে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে?
আসন্ন নির্বাচনে পরিবেশ ও জলবায়ু আর প্রান্তিক বিষয় নয়; বরং মূলধারার আলোচনায় উঠে এসেছে—বিভিন্ন দলের ইশতেহারে তা স্পষ্ট। আগের তুলনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা ও জলবায়ু কূটনীতির মতো বিষয়ে তুলনামূলক বিস্তৃত অঙ্গীকার এসেছে। এটি নীতিগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে অঙ্গীকারের ভাষা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয় না। বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ব্যারেজ নির্মাণ, শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণ বা কার্বন ট্রেডিং—এসব উদ্যোগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল অপরিহার্য। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; প্রাকৃতিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
নদী ব্যবস্থাপনা ও ব্যারেজ নির্মাণে সতর্কতা জরুরি। অবাধ নদীপ্রবাহ, পলিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি এবং ডেল্টা অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় না নিলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হতে পারে। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বায়ুদূষণ ও নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প, ইটভাটা, পুরোনো যানবাহন ও নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ না হলে নাগরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে না। ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ এবং স্বাধীন পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি জবাবদিহি। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না হলে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা আসে না। পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা, নারী-শিশুর অধিকার ও তরুণদের কর্মসংস্থান—এসব প্রশ্নে আমাদের স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
গ্রীন ভয়েস দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের সম্পৃক্ত করে পরিবেশ সচেতনতা, পাঠচক্র, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং নারী-শিশুসহ নানা সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ-সংবেদনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু মূল্যবোধের প্রশ্নে আপস করা যায় না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে উন্নয়ন মানে প্রকৃতি ধ্বংস নয়; যেখানে অর্থনীতি ও পরিবেশ পরস্পরের পরিপূরক; যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাতাস, নির্মল পানি ও সবুজ ভূমি নিশ্চিত হবে।
নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা থাকবেই। কিন্তু সহিংসতা, ভীতি ও বিভাজন কখনও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। আমরা প্রত্যাশা করি, আগামীকালের নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য। প্রত্যেক নাগরিক যেন নিরাপদে ভোট দিতে পারেন—এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
তরুণ ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান—শুধু ভোট দেবেন না; সচেতন থাকবেন, প্রশ্ন করবেন, তথ্য যাচাই করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব নয়, সত্য ও যুক্তিকে প্রাধান্য দিন। নির্বাচিত সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করছে কি না, সে বিষয়েও নজর রাখুন।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জলবায়ু প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDGs) অর্জনে রাষ্ট্রগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু কাগজে-কলমে প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক চাপ। নির্বাচন সেই চাপ সৃষ্টির সবচেয়ে বড় সুযোগ।
ভোট একটি অধিকার, আবার দায়িত্বও। আমরা যাকে নির্বাচন করব, তিনি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন। তাই ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং নীতি ও কর্মপরিকল্পনাকে বিবেচনায় আনুন। উন্নয়ন চাই, কিন্তু তা হোক টেকসই; প্রবৃদ্ধি চাই, কিন্তু তা হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক; অগ্রগতি চাই, কিন্তু তা হোক মানবিক।
আগামীকাল আমরা যখন ভোটকেন্দ্রে যাব, মনে রাখব—এটি কেবল একটি দিন নয়; এটি আগামী পাঁচ বছরের দিকনির্দেশনা। একটি ভোট হয়তো ক্ষুদ্র মনে হতে পারে, কিন্তু সম্মিলিতভাবে সেটিই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা—এই হোক আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার।
আগামীকাল হোক দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের দিন; হোক সবুজ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের পথে নতুন পদক্ষেপ।
আলমগীর কবির
প্রতিষ্ঠাতা, গ্রীন ভয়েস
সাধারণ সম্পাদক, বাপা