বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশ দূষণ এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার মধ্যে বায়ু দূষণ অন্যতম। বিশেষ করে নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং যানবাহনের ধোঁয়া জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এটি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA) এবং সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (CAPS) এর যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ু দূষণের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১,০২,৪৫৬ জন মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। বায়ু দূষণের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর একটি বিশদ তালিকা গবেষণায় পাওয়া গেছে: হৃদরোগ: ২৯,৯২০ জন,স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ): ২৩,০৭৫ জন,সিওপিডি (ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি): ২০,৯৭৬ জন,নিউমোনিয়া ও নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ: ৯,৭২০ জন,ফুসফুসের ক্যান্সার: ৩,০৬৩ জন এবং শিশু মৃত্যু: ৫ বছরের কম বয়সী ৫,২৫৪টি শিশু- বায়ু দূষণজনিত কারণে প্রাণ হারায়। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য শক্তিই পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবচেয়ে কার্যকর টেকসই পথ হিসেবে আশার আলো দেখাচ্ছে, আর এই আন্দোলনে তরুণ সমাজই প্রধান দিশারী।
বায়ু দূষণের অদৃশ্য শিকার: সংকট ও কারণ
বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণা (PM2.5), কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ, হৃদরোগ এবং এমনকি ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দূষিত ।বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত কারণে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৮ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ঘটে থাকে। ধারনা করা হয়,ঢাকার এই ভয়াবহ অবস্থার মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ধোঁয়া, আশপাশের ইটভাটা এবং শিল্প-কারখানার নির্গমন। এই সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ।
নবায়নযোগ্য শক্তি: সবুজ ভবিষ্যতের দিশারী
‘২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ ক্লিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশের বায়ুমান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রদত্ত গাইডলাইন অনুযায়ী হবে।
১) ভবিষ্যতে বায়ু দূষণের মারাত্মক প্রভাব হ্রাস করার জন্য নতুন প্রণীত বায়ু দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২ এ কমপক্ষে পূর্ববর্তী মান প্রতিঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম বজায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে তরুণরা বিভিন্ন এডভোকেসি গ্রুপ তৈরি করে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করতে পারে।
২) তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহযোগিতা প্রদানকারী দেশগুলো নিজ দেশে যেভাবে ইমিশনের মানমাত্রা মেনে চলে, একইভাবে বাংলাদেশেও তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইমিশনের মান মাত্রা বজায় রাখতে হবে,তরুণরা এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সাথে গঠনমূলক আলোচনাসভা এবং কার্যকারী নেতৃত্বে আসতে পারে।
৩) কম সালফারযুক্ত (৫০ পিপিএম) ডিজেল আমদানি ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ এ সকল কয়লা, তেল ও গ্যাস ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্লান্টকে পূর্বের মত (পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-১৯৯৭) লাল শ্রেণীভুক্ত রাখার কার্যকারিতার আওতায় আসতে হবে।
৪) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক কপ২৬ এর ঘোষণা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০% ক্লিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তরুণরা বিভিন্ন কমিউনিটি প্রজেক্ট তৈরি করে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রায় নেতৃত্ব দিতে পারবে।
তাছাড়া নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো:
তরুণ সমাজ: পরিবর্তনের চালিকাশক্তি
বায়ু দূষণ রোধে তরুণ সমাজই হতে পারে পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং পরিবেশ সচেতনতা এই ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে । সম্প্রতি শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের Youth for CARE ওয়ার্কশপে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল , যেখানে আমাদের মূল ফোকাসই ছিল নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা যায় । এই ওয়ার্কশপে আমরা বায়ু দূষণ রোধে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছি এবং আমাদের দলের মূল লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি নির্ভর পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা ।
আমাদের প্রস্তাবনাগুলো ছিল:
তরুণরা শুধু উদ্ভাবনী প্রকল্প তৈরি করেই থেমে থাকছে না, তারা গণসচেতনতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সেমিনার এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তারা নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব ও এর ব্যবহার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করছে। এটি নবায়নযোগ্য শক্তিকে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করবে।
সবুজ বিশ্বের পথে: সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশ সংবিধান অনুসারে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে। এই সবুজ ও টেকসই উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নীতিগত সমর্থন অপরিহার্য। এক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে নগর কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত নির্মাণ কাজের দূষণ বন্ধ করা, যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ বান্ধব গণ পরিবহনের ব্যবস্থা করা।নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে, আমরা বায়ুতে নির্গত ক্ষতিকারক দূষকের পরিমাণ হ্রাস করতে পারি এবং মানব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর বায়ু দূষণের প্রভাব হ্রাসও করতে পারি। এই লক্ষ্য অর্জনে লক্ষ্যাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষত, নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা, নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, এবং সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে তরুণদের বায়ু মান পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণ এবং সবুজ পরিবহন ও ভবন নির্মাণে প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
লেখা:
মাহমুদুল হাছান তাছিন
সদস্যসচিব
গ্রীন ভয়েস,সরকারি তিতুমীর কলেজ।